নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত কেউই স্বস্তিতে নেই! দ্রব্য মূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ বনাম সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো ভয়ংকর প্রস্তাব
গতকাল ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ইং সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো প্রস্তাব করেছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। তাতে ১০০ শতাংশ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে, সর্বনিম্ন স্তর অর্থাৎ ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। আর সর্বোচ্চ স্তর প্রথম গ্রেডে বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার (২১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে কমিশন তাদের প্রস্তাবনার প্রতিবেদন জমা দেন।
তাদের দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে বেতন-ভাতা বাবদ বছরে আরও ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে। এ বিষয়ে কালের কণ্ঠের প্রথম পাতার একটি খবরের শিরোনাম— সরকারি চাকুরেদের বেতন বৃদ্ধি উসকে দিতে পারে মূল্যস্ফীতি। এতে বলা হয়েছে, পরিকল্পনা কমিশনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, বেতন বাড়ানোর পরই দেখা যাবে বাজারে সব পণ্যের দাম দেড়-দুইগুণ বেড়ে গেছে। ফলে বেতন বাড়ায় তাদের তেমন লাভ হবে না। তাই বেতন বাড়ানোর চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বেশি জরুরি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ব্যয়ের জন্য জনগণ ও অর্থনীতি প্রস্তুত কি না, তা যাচাই জরুরি। সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ না করে পে স্কেল বাস্তবায়ন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাওয়া অর্থনীতি এখনো মজুরি বাড়ানোর মতো সক্ষমতায় পৌঁছায়নি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়লে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি টেকসই হবে না। যদিও দীর্ঘদিনের চড়া মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় রেখে এ প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে, পণ্যের দাম কম থাকলে বর্তমানে পাওয়া বেতন দিয়েই চলতে পারবেন তারা। তাই বেতন বৃদ্ধি করলেই সমাধান হবে না বরং দ্রব্য-মূল্য ও তার সাথে আনুসাঙ্গিক বিষয়গুলোর মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বেতন না বাড়িয়েও সমাধান করা সম্ভব। কেন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না তার কি কি কারণ আছে তার রুট কজ এনালাইসিস করা প্রয়োজন। যেমন- বিদ্যুতের উচ্চ মূল্যের জন্য সেচের খরচ, ডিজেলের দাম বেশী হওয়ায় পরিবহণ খরচ, গ্যাসের দাম বেশী হওয়ায় বিভিন্ন উৎপাদন খরচ, সারসহ কৃষিজাত বীজের মূল্য বেশী হওয়ায় সাক-সবজি ও চালের দাম, মৎস খাদ্যের দাম বাড়ায় মাছের মূল্য ইত্যাদিসহ বহু উদাহরণ আছে দাম বৃদ্ধির পিছনে। যার ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে কিছু অসাধু সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীতো আছেই এক টাকা বাড়লে তারা পণ্যের কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে একটু চিন্তাও করে না। শীতকালীন সবজি সীম, টমেটো, ফুলকপি, বেগুন, লাউ ইত্যাদি এই সময়ে এত বেশী দাম যা কল্পনাও করা যায় না। ৬০-১২০ টাকা কেজি অধিকাংশ সাক-সবজির। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় রেকর্ড সংখ্যক দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। মনে হচ্ছে প্রতিদিনই দাম বৃদ্ধির নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের অন্যতম এজেন্ডা দ্রব্য-মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার চেষ্ট্রাও করে যাচ্ছে। কিন্ত এখনো তার প্রভাব তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দাম বেড়ে যাচ্ছে ৬-৭ গুণ পর্যন্ত। তাই অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে বেশ কিছু সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দ্রব্যমূল্যের দাম কমাতে সরকারের ভূমিকা যেমন সবচেয়ে বেশী ঠিক তেমনি কৃষক, কালেক্টর, আড়তদার, খুচরা বিক্রেতা এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের ভূমিকা অনেক। নিম্নে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে খোলা চিঠি।/ সুপারিশ –
১) ডিজেল, পেট্রোল, বিদ্যুৎ, গ্যাসের দাম সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসা;
২) সার, কীটনাশক, মৎস্য খাদ্যের দাম কমিয়ে সরকারের ভর্তিকি দেওয়া;
৩) কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদপ্তরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কৃষি পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো এবং তাদের নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে বাজার তদারকি ব্যবস্থা করা; কারণ- জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষে একা সম্ভব হচ্ছে না, তাদের লোকবল বাড়িয়ে আরও সক্রিয় করা;
৪) অসাধু অতি মুনাফাকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা;
৫) পথে পথে ও বাজারে পুলিশ ক্ষমতাসীন দলের লোকদের চাঁদাবাজি বন্ধ করা;
৬) আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে বাজার মনিটরিং টিম গঠন করা;
৭) পণ্য সরবরাহকে ডিজিটাল করতে মোবাইল অ্যাপ তৈরী করে সেখানে ভ্যালু চেইনে কৃষক থেকে আড়তদার এবং ভোক্তা পর্যন্ত প্রত্যেক পণ্যের মূল্য দৃশ্যমান রাখা। অ্যাপে গড় উৎপাদন খরচ, কৃষক পর্যায়ে বিক্রয় দর, ভোক্তা পর্যায়ে খুচরা বিক্রি/ দর নিয়মিত উল্লেখ করা;
৮) কৃষি ও বানিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং জাতীয়ভাবে সময়ে সময়ে উচ্চ পর্যায়ে সভা করে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে কাজ করা ইত্যাদি।
উল্লেখিত সমন্বিত উদ্যোগগুলো নিতে পারলে কৃষক যেমন ন্যায দাম পাবে, সেই সাথে ভোক্তা পর্যায়ে স্বস্তি ফিরে আসবে। তথাপি সবকিছুর দাম হাতের নাগালে আসলে মানুষের হতাশা ও ক্ষোভ হ্রাস পাবে। এতে মানসিক প্রশান্তি ও শান্তি অনুভব হবে।
…
মো. আমানুল্লাহ
একজন উন্নয়নকর্মী
২২ জানুয়ারি, ২০২৬ইং